বহিষ্কার ও গণপদত্যাগের কারণে সংকটে পড়েছে মুন্সীগঞ্জ বিএনপি। স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার কারণে জেলা বিএনপির সদস্য সচিব মো. মহিউদ্দিনকে বহিষ্কার করা হয়েছে। এছাড়া আহ্বায়ক ও সাবেক মন্ত্রী মিজানুর রহমান দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ থাকার কারণে সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন। ৫৯ সদস্য বিশিষ্ট আহ্বায়ক কমিটির কয়েকজনকে বহিষ্কার করা হয়েছে এবং ৪-৫ জন পদত্যাগ করেছেন। বহিষ্কারের পাশাপাশি গণপদত্যাগও চলছে, বিশেষ করে মুন্সীগঞ্জ সদর ও গজারিয়া উপজেলা নিয়ে গঠিত মুন্সীগঞ্জ-৩ নির্বাচনী এলাকায়।
শুক্রবার (৩০ জানুয়ারি) বেলা ১১টার দিকে গজারিয়া উপজেলায় ২২ জন এবং রাতে মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলায় ৬২ জন মিলিয়ে ৮৪ জন নেতাকর্মী সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে দল থেকে পদত্যাগ করেন।
স্থানীয় নেতাকর্মীরা জানিয়েছেন, সাংগঠনিকভাবে এ পদত্যাগের কোনো ভিত্তি নেই। পদত্যাগকারীরা মূলত স্বতন্ত্র প্রার্থীর “পকেট কমিটি”র লোকজন বলে জানান বিএনপির মনোনীত প্রার্থীর অনুসারিরা।
আসন্ন ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে, দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে মুন্সীগঞ্জ-৩ আসনে জেলা বিএনপির সদস্য সচিব ও সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি মো. মহিউদ্দিন এবং মুন্সীগঞ্জ-১ আসনে জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য মোহাম্মদ মমিন আলী স্বতন্ত্র প্রার্থী হলে, গত ২২ জানুয়ারি তাদের নিজ নিজ পদ ও দলের প্রাথমিক সদস্য পদ থেকেও বহিষ্কার করা হয়।
এরপর দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ ও সংগঠনবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে ২৪ জানুয়ারি মুন্সীগঞ্জ জেলা যুবদলের সাবেক সদস্য সচিব স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. মহিউদ্দিনের অনুসারি মুহাম্মদ মাসুদ রানাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়।
২৬ জানুয়ারি মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও জেলা আহ্বায়ক কমিটির সদস্য সাইদুর রহমান ফকির এবং গজারিয়া উপজেলার জেলা আহ্বায়ক কমিটির সদস্য মজিবুর রহমান (ওরফে বালু মজিবুর) কে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়।
২৮ জানুয়ারি বিকেলে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী স্বাক্ষরিত এক পত্রে স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. মহিউদ্দিনের ছোট ভাই পঞ্চসার ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মতিন, মহাকালি ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি নাসির উদ্দিন ভূইয়া ও রামপাল ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি শফিকুল ইসলাম শওকতকে বহিষ্কারসহ মহাকালি ইউনিয়ন ও রামপাল ইউনিয়ন বিএনপির কমিটি বিলুপ্ত করা হয়।
২৮ জানুয়ারি সন্ধ্যায় সদর উপজেলার পঞ্চসার এলাকায় এক সংবাদ সম্মেলনে পদত্যাগ করেন মুন্সীগঞ্জ পৌর বিএনপির সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট মাহবুব আলম স্বপন, জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য আতাউর হোসেন বাবুল, কাজী আবু সুফিয়ান বিপ্লব ও শাহাদাত হোসেন সরকার। ৪ জনই মুন্সীগঞ্জ-৩ আসনের বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী মো. মহিউদ্দিনের অনুসারী হিসেবে পরিচিত।
এর আগে, ২৭ জানুয়ারি রাতে দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে সংগঠনবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার কারণে জেলা বিএনপির ৪ সদস্য—দেলোয়ার হোসেন, তাজুল ইসলাম, আওলাদ হোসেন উজ্জ্বল, জসিম মোল্লা; জেলা মহিলা দলের সভাপতি সেলিনা আক্তার বীনা; সিরাজদিখান উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আওলাদ হোসেন ভূঁইয়া; সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক মহিউদ্দিন আহম্মেদ; কোলা ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবু তাহেরসহ ৮ জনকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়।
একইদিন (৩০ জানুয়ারি) বেলা ১১ টার দিকে গজারিয়া উপজেলার রসূলপুর খেয়াঘাট সংলগ্ন বিএনপির অস্থায়ী কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে গজারিয়া উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব আব্দুর রহমান শফিকসহ ২২ জন অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী দল থেকে স্বেচ্ছায় পদত্যাগের ঘোষণা দেন। তারা অভিযোগ করেন, তৃণমূল নেতাদের মতামত উপেক্ষা করা হয়েছে এবং জনপ্রিয় নেতাদের বহিষ্কৃত করা হয়েছে।
এরপর রাতে সদর উপজেলার মুক্তারপুরে স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. মহিউদ্দিনের অফিসে সংবাদ সম্মেলন করে জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য মাহবুবুর রহমান, মিরকাদিম পৌর বিএনপির সদস্য সচিব ওবায়দুর রহমান বকুলসহ ছাত্রদল, যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের ৬৪ নেতাকর্মী দলত্যাগের ঘোষণা দেন।
পদত্যাগ ও বহিষ্কারের বিষয়ে জেলা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক জাহিদুর রহমান জামাল বলেন, "মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও জেলা বিএনপির সদস্য সচিব মো. মহিউদ্দিন দলের সিদ্ধান্ত অমান্য করে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন। তিনি দীর্ঘ বছর ধরে দলের পদ দখল করে নিজের লোকজন বিভিন্ন কমিটিতে বসিয়েছেন। বহিষ্কৃত হওয়ার ভয়ে তার পকেট কমিটির কিছু কর্মী দল থেকে পদত্যাগের কথা শুনানো যাচ্ছে। তবে পদত্যাগের জন্য নিয়ম হলো—যে সংগঠন থেকে পদত্যাগ করবেন, সেই সংগঠনের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে লিখিতভাবে পদত্যাগপত্র জমা দিতে হবে। তাদের পদত্যাগের সাংগঠনিক কোনো ভিত্তি নেই।"
জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য রফিকুল ইসলাম ভিপি মাসুম বলেন, "এরা দলের তেমন গুরুত্বপূর্ণ কেউ নন। বহিষ্কার আতঙ্কে তারা দল থেকে পদত্যাগ করেছেন। তবে এসব পদত্যাগের সাংগঠনিক ভিত্তি নেই এবং এরা স্বতন্ত্র প্রার্থীর পকেট কমিটির লোকজন।"
বিএনপির মনোনীত প্রার্থী ও কেন্দ্রীয় বিএনপির সমাজকল্যাণ সম্পাদক মো. কামরুজ্জামান রতন বলেন, "দলের পরিচয় দিয়ে দলের ক্ষতি করবেন এবং দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থীর পক্ষে কাজ করছেন—এটা তারা উপলব্ধি করেছেন। তাদের এই আত্ম-উপলব্ধি থেকে দল ছেড়ে স্বতন্ত্র প্রার্থীর হয়ে কাজ করার জন্য তাদের সাধুবাদ জানাই।"
এমএইচ/আরএন