বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনে সারা বছর জীবিকার তাগিদে জেলে, বাওয়ালি, মৌয়ালসহ লক্ষাধিক মানুষ যাতায়াত করলেও তাঁদের চিকিৎসাসেবার জন্য বনাঞ্চলে কোনো স্থায়ী হাসপাতাল নেই। ফলে সামান্য অসুস্থতা থেকে শুরু করে বাঘ, কুমির কিংবা বিষধর সাপের আক্রমণে গুরুতর আহত বনজীবীরা চরম ঝুঁকির মুখে পড়ছেন। চিকিৎসার অভাবে পথেই ঝরছে তাদের প্রাণ।
বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ২০১০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে সুন্দরবনের পূর্ব ও পশ্চিম বিভাগে দুটি ভাসমান হাসপাতাল নির্মাণের জন্য পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ে একটি প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু ১৫ বছর পেরিয়ে গেলেও প্রকল্পটি বাস্তবায়নের কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি।
বছরজুড়ে জীবিকার ঝুঁকি:
সুন্দরবনের পূর্ব ও পশ্চিম বিভাগের আওতাধীন চারটি রেঞ্জ এবং সাগর উপকূলে মৌসুমভিত্তিকভাবে বনজীবীদের আগমন ঘটে। প্রতিবছর অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত শুঁটকি মৌসুম, এপ্রিল থেকে জুলাই পর্যন্ত ইলিশ, মধু ও মোম আহরণ মৌসুম এবং বছরের অন্য সময় গোলপাতা, গরান, মেলে ও অন্যান্য সম্পদ আহরণ মৌসুমে হাজার হাজার মানুষ গভীর বনে প্রবেশ করেন।
এ সময় বিশুদ্ধ পানির সংকট, চিকিৎসাসেবার অভাব এবং হিংস্র প্রাণীর আক্রমণ নিত্যদিনের বাস্তবতা। বনজীবীদের ভাষ্য অনুযায়ী, গুরুতর অসুস্থ হলে বা দুর্ঘটনায় আহত হলে দ্রুত চিকিৎসা পাওয়ার কোনো ব্যবস্থা নেই।
১৫ ঘণ্টার পথ, মাঝপথেই মৃত্যু:
বন বিভাগ জানায়, মোংলা থেকে নদীপথে দুবলা জেলেপল্লির দূরত্ব প্রায় ৯০ কিলোমিটার। অন্যদিকে শরণখোলা থেকে নদীপথে দুবলা জেলেপল্লির দূরত্ব প্রায় ৭০ কিলোমিটার। চিকিৎসার জন্য এগুলোই সবচেয়ে কাছে থাকা সরকারি হাসপাতাল। দুর্গম বনাঞ্চলে কেউ অসুস্থ বা আহত হলে ট্রলার অথবা নৌকায় করে হাসপাতালে পৌঁছাতে অন্তত ১৪ থেকে ১৫ ঘণ্টা সময় লাগে। এ দীর্ঘ যাত্রাপথেই অনেক সময় চিকিৎসার অভাবে প্রাণ হারান বনজীবীরা। আবার সাপে কাটা রোগি পৌঁছাতে পারলেও এসব হাসপাতালে এন্টিভেরাম নেই। তখন আরও ৬০ থেকে ৭০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে বাগেরহাট সদর হাসপাতালে যেতে হয় রোগীদের। ফলে সাপে কাটা রোগীদের প্রায়ই বাঁচানো যায় না।
ফার্মেসি আছে, চিকিৎসক নেই:
সুন্দরবনের জেলা, মৌয়াল ও বনরক্ষীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মেহের আলীর চর, আলোর কোল, অফিস কিল্লা, মাঝের কিল্লা, শেলার চর, নারকেলবাড়িয়া, আমবাড়িয়া, মানিকখালী ও কোকিলমনি এলাকাসহ কয়েকটি চরে ৫-৬টি ফার্মেসি থাকলেও সেখানে কোনো চিকিৎসক নেই।
তাদের ভাষায়, “জ্বর বা ডায়রিয়ার ওষুধ ছাড়া কিছুই পাওয়া যায় না। কেউ মারাত্মক অসুস্থ হলে বা হাত-পা কেটে গেলে আল্লাহকে ডাকা ছাড়া আমাদের আর কোনো উপায় থাকে না।”
দীর্ঘদিনের দাবি উপেক্ষিত:
শরণখোলা মৎস্যজীবী ও মালিক সমিতির সভাপতি আবুল হোসেন বলেন, “লক্ষাধিক বনজীবী সারা বছর সুন্দরবনে কাজ করে। অথচ তাদের চিকিৎসার জন্য সরকারের কোনো ব্যবস্থা নেই। বহু আগে হাসপাতাল হওয়ার কথা শুনেছিলাম, কিন্তু আজও বাস্তবায়ন হয়নি।”
দুবলা ফিশারম্যান গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক কামাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, “সুন্দরবনের রাজস্ব আয়ে বনজীবীদের অবদান সবচেয়ে বেশি। তাদের স্বাস্থ্যসেবার নিশ্চয়তা দেওয়া সরকারের মৌলিক দায়িত্ব। কিন্তু হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার দাবি আজও উপেক্ষিত।”
ম্যানগ্রোভ ভিউ বাংলাদেশ পর্যটনের স্বত্তাধীকারী রাসেল আহমেদ জানান, দেশি-বিদেশী পর্যটকরা সুন্দরবনে গিয়ে অসুস্থ হলে চিকিৎসার জন্য কোনো ডাক্তার নেই। এটা পর্যটনের জন্য একটি বড় প্রতিবন্ধকতা।
বনরক্ষীরাও ঝুঁকিতে:
শুধু বনজীবী নয়, সুন্দরবন রক্ষায় নিয়োজিত বনকর্মীরাও একই সংকটে ভুগছেন। সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের আওতায় থাকা দুটি রেঞ্জের (শরণখোলা ও চাঁদপাই) ২ লাখ ৪৩ হাজার হেক্টর বনভূমি সুরক্ষায় ৩১টি ইউনিট অফিসের কর্মরত বনরক্ষীরাও চিকিৎসা বঞ্চিত।
করমজল বন্য প্রাণী ও কুমির প্রজনন কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হাওলাদার আজাদ কবির বলেন, “বাঘ, কুমির ও বিষাক্ত সাপের ঝুঁকি নিয়ে আমাদের কাজ করতে হয়। কেউ আহত হলে নৌকায় করে লোকালয়ে যেতে ১৪-১৫ ঘণ্টা সময় লাগে। রেসকিউ বোট ও ভাসমান হাসপাতাল থাকলে সবার উপকার হতো।”
শরণখোলা ফরেস্ট রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক রানা দেব বলেন, “বনজীবী ও বনকর্মীদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা আমাদের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। হঠাৎ কেউ অসুস্থ হলে তাকে উদ্ধার করে এনে চিকিৎসা দেওয়া অনেক ক্ষেত্রেই অসম্ভব হয়ে পড়ে। বৈরি আবহাওয়ার পাশাপাশি দুর্গম বনাঞ্চলে রেসকিউ করা কঠিন কাজ।”
আশ্বাস থাকলেও বাস্তবায়ন অনিশ্চিত:
পূর্ব সুন্দরবনের বিভাগীয় কর্মকর্তা রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, “বনজীবী ও বনরক্ষী—দু’পক্ষের জন্যই হাসপাতাল প্রয়োজন। সুন্দরবন সুরক্ষা প্রকল্পের আওতায় বর্তমানে একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক মাসে দুই বার শরণখোলা ও চাঁদপাই রেঞ্জে চিকিৎসা দিতে আসেন। তবে তা পর্যাপ্ত নয়। পূর্ব ও পশ্চিম বিভাগের জন্য মৌসুমভিত্তিক দুটি ভাসমান হাসপাতাল স্থাপনের একটি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও সরকারের অর্থায়নে ২০২৮ সালের মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের আশা করছি।”
তবে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতায় বনজীবীদের শঙ্কা এই আশ্বাস আদৌ বাস্তবে রূপ নেবে কি না, সে প্রশ্নের উত্তর এখনও অধরা। তাদের দাবি, সুন্দরবন থেকে তারা প্রতিবছর কোটি কোটি টাকা রাজস্ব প্রদান করেন। ফলে বনজীবীদের চিকিৎসার বিষয়টি সরকারের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
আরএন