Wednesday | 21 January 2026 | Reg No- 06
Epaper | English
   
English | Wednesday | 21 January 2026 | Epaper
BREAKING: কড়াইল বস্তিবাসিদের জন্য ফ্ল্যাট নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দিলেন তারেক রহমান      নির্বাচনের আগে লুট হওয়া অস্ত্র দ্রুত উদ্ধারের তাগিদ প্রধান উপদেষ্টার      বাড়ির মালিক-ভাড়াটিয়াদের জন্য ডিএনসিসির নির্দেশনা      পরিকল্পিত ভাবে বিএনপির বিরুদ্ধে প্রচারণা হচ্ছে দাবি ফখরুলের      ফের ইভ্যালির রাসেল-শামীমা গ্রেপ্তার      ভবিষ্যতের বাংলাদেশ হবে বৈষম্যহীন: জামায়াত আমির      চানখারপুলে ৬ হত্যা মামলার রায় পেছালো      

অব্যবস্থাপনায় ঢাবির পরিবহনে মাসে ১ কোটি টাকার বেশি ব্যয়

Published : Wednesday, 4 June, 2025 at 7:42 PM  Count : 504

অনাবাসিক শিক্ষার্থীদের পরিবহণ ব্যবস্থার অংশ হিসেবে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহণ কর্পোরেশন (বিআরটিসি)-এর সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) একটি চুক্তি রয়েছে। চলতি বছরের মে মাসে বিআরটিসির বাসগুলো মোট ২০ দিন চলেছে। এই সময়ে বাসগুলো মোট ২ হাজার ৮৩১টি ট্রিপ সম্পন্ন করে। গড়ে প্রতিদিন প্রায় ১৪২টি ট্রিপ দেয়।

২০ দিনের ট্রিপে মোট ব্যয় হয় ১ কোটি ৮ লাখ ৩২ হাজার ১৭১ টাকা, যা গড়ে প্রতিদিনের ব্যয় হিসেবে দাঁড়ায় প্রায় ৫ লাখ ৪১ হাজার ৬০৯ টাকা।

ঢাবির প্রধান পরিবহণ সহকারী ফারুক হোসেন ডেইলি অবজারভারকে বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

অর্থনীতিবিদ ও ঢাবির অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ শাহাদাত হোসেন সিদ্দিকী বলেন, “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান হলেও, আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার ক্ষমতা রাখে না। পর্যাপ্ত আর্থিক পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনার অভাবে সরকারি সুবিধাগুলো যথাযথভাবে কাজে লাগানো যাচ্ছে না। দিন দিন প্রতিষ্ঠানটি তার কার্যক্ষমতা হারাচ্ছে।”

ঢাবির আইকনিক ডাবল ডেকার এই বাসগুলো “লাল বাস” নামে পরিচিত। ঢাবির পরিচালিত এই বহরে মোট ১৫টি নামযুক্ত বাস রয়েছে: ‘ইশা খাঁ’, ‘ক্ষণিকা’, ‘তরঙ্গ’, ‘চৈতালী’, ‘বৈশাখী’, ‘উল্লাস’, ‘শ্রাবণ’, ‘কিঞ্চিৎ’, ‘বসন্ত’, ‘মৈত্রী’, ‘আনন্দ’, ‘ফাল্গুনী’, ‘হেমন্ত’ এবং ‘উয়ারী বটেশ্বর’। এছাড়াও শিক্ষার্থীদের সুবিধার্থে মাওয়া (বিক্রমপুর) রুটে একটি নির্দিষ্ট বাস চলে।

এই বাসগুলো মূলত ভারত থেকে আমদানি করা হয়। বিআরটিসির আওতায় এ ধরনের বাস কেনার একমাত্র এখতিয়ার সরকারেরই রয়েছে।

ড. শাহাদাত 'অফিস টাইম' শেষ হওয়ার পরও এসব বাস বাণিজ্যিক পরিবহণ হিসেবে ব্যবহার করা নিয়ে সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, “এই বাসগুলো কেবল শিক্ষার্থীদের চলাচলের জন্যই নির্ধারিত থাকা উচিত।” তিনি এই 'অপব্যবহারকে' বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনামের উপর গুরুতর আঘাত হিসেবে উল্লেখ করেন।

অফিস সময় শেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দোতলা বাসগুলো ফার্মগেট, মিরপুর, যাত্রাবাড়ী, বাড্ডা, কল্যাণপুর, এমনকি সাভারের মতো এলাকায় লোকাল বাসের মতো চলাচল করে। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব পরিবহণ ব্যবস্থার এই ব্যবহারে প্রশ্ন উঠেছে স্বচ্ছতা ও দায়িত্ববোধ নিয়ে। একটি দোতলা বাসে গড়ে ৭০ থেকে ৮০ জন যাত্রী উঠতে পারেন। রাতের এই যাতায়াতে প্রতি যাত্রায় ভাড়া নেয়া হয় ২০ থেকে ৩০ টাকা, যা ড্রাইভার ও সহকারীর মাধ্যমে সংগ্রহ করা হয়। প্রতিদিন একাধিক রাউন্ডে চলার ফলে একজন চালক ও সহকারী গড়ে ২ হাজার থেকে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করতে পারেন।

ধাপে ধাপে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বর্তমানে ডিজেলের প্রতি লিটার দাম ১০২ টাকা। বিআরটিসির জনসংযোগ দফতরে কথা বলে জানা গেছে এই দোতলা বাসের গড় জ্বালানি সক্ষমতা প্রতি লিটার প্রায় ৩ কিলোমিটার। একটি ট্রিপে গড় দূরত্ব ধরা যেতে পারে ৩০ কিলোমিটার, যা সাধারণত মিরপুর বা সাভার রুটে যাওয়া-আসার মধ্যে পড়ে। সেই হিসেবে দুই ট্রিপে মোট ৬০ কিলোমিটার পাড়ি দিতে হয়।

এই ৬০ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করার জন্য বাসটির প্রয়োজন পড়ে আনুমানিক ২০ লিটার ডিজেল, যার মোট খরচ দাঁড়ায় ২ হাজার ৪০ টাকা। অপরদিকে, প্রতিটি ট্রিপে গড়ে ৭০ জন যাত্রী উঠে এবং প্রত্যেকে গড়ে ২৫ টাকা করে ভাড়া দেয়। দুই ট্রিপ মিলিয়ে মোট আয় হতে পারে ৩ হাজার ৫০০ টাকা

তাহলে জ্বালানি খরচ বাদ দিলে ড্রাইভার ও সহযোগী মিলে একদিনে আনুমানিক ১ হাজার ৪৬০ টাকা রোজগার করতে পারেন। এই অনিয়ম যদি প্রতিদিন চলতে থাকে, তাহলে মাস শেষে তাদের আয় লক্ষাধিক টাকায় পৌঁছাতে পারে, যা কোনোভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাব বা নজরদারির আওতায় আসে না। এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পদের বেহিসাবি ব্যবহারের একটি স্পষ্ট উদাহরণ।

এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের তেল, মেরামত ও মানবসম্পদ ব্যবস্থার অপব্যবহার ঘটছে, অথচ এই অর্থ কোনো রাজস্ব হিসাবেও যুক্ত হচ্ছে না। যাত্রীদের অনেকেই জানেন না যে এটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস, কেউ কেউ জানলেও বলেন, “ভাড়া নিচ্ছে, তাই উঠতে অসুবিধা কোথায়?” এই মনোভাব একদিকে যেমন অনিয়মকে উৎসাহিত করে, অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পদের যথেচ্ছ ব্যবহারের সংস্কৃতি গড়ে তোলে। এই বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।

তার মতে, এই বাসগুলোতে জনসাধারণের প্রবেশ সীমিত করা অত্যন্ত জরুরি; অন্যথায় দুর্নীতিপরায়ণ চালকরা ও তাদের সহযোগীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসকে অবৈধ আয়ের উৎস হিসেবে ব্যবহার করতে পারে।

এই ধারা যদি পুরো বছর জুড়ে অব্যাহত থাকে এবং মাসে গড়ে ২০ দিন বাস চালানো হয়, তবে বছরে মোট ট্রিপের সংখ্যা দাঁড়াবে প্রায় ৩৩ হাজার ৯৭২টি। সেই অনুযায়ী, বিআরটিসি পরিবহণ চুক্তির আওতায় বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস পরিচালনার আনুমানিক বার্ষিক ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ১২ কোটি ৯৯ লাখ টাকা।

বিশ্ববিদ্যালয়টি বিকল্পভাবে তাদের বাস বহর সম্প্রসারণে বিনিয়োগ করতে পারে। দেশের বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী, একটি নতুন নন-এসি সিঙ্গেল-ডেকার বাসের দাম প্রায় ৫০ লাখ টাকা এবং একটি এসি বাসের দাম প্রায় ৮০ লাখ টাকা। এই দরের ভিত্তিতে, প্রতিবছর একই বাজেট ব্যবহার করে ঢাবির জন্য প্রায় ২৬টি নন-এসি বাস অথবা ১৬টি এসি বাস কেনা যায়। নতুন যানবাহনে মূলধন বিনিয়োগের তুলনায় বর্তমান পরিচালন ব্যয় অনেক বেশি।

ফারুক হোসেন বলেন, “বহিরাগত পরিবহনের ওপর নির্ভর করার বদলে বিশ্ববিদ্যালয় চাইলে এই অর্থ নিজস্ব বহর সম্প্রসারণে ব্যয় করতে পারে। এটি পরিবহণ সমস্যার একটি দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই সমাধান হবে এবং ব্যয়বহুল বাহ্যিক সেবার উপর নির্ভরতা কমাতেও সহায়ক হতে পারে।”

অধ্যাপক শাহাদত বলেন, “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো টেকসই পরিবহণ ব্যবস্থা নেই। নিজস্ব বহর বিস্তৃত করবে, নাকি সংকুচিত করবে, কিংবা কীভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পদগুলো কার্যকরভাবে ব্যবহার করবে সেসকল বিষয়ে কর্তৃপক্ষের কোনো স্পষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি নেই।”

তিনি বলেন, “সরকার প্রতি বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে দুইটি করে ডাবল-ডেকার বাস দিতে পারে। ১০ বছরের বাজেট পরিকল্পনায় ২০ টি বাস পাওয়া যেতে পারে। সেই ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেবল জ্বালানির খরচই বহন করতে হতে পারে। আমি নিশ্চিতভাবে বলতে পারি, ভাড়ায় চালিত বাস পরিচালনার খরচের সঙ্গে যদি নিজস্ব বাসের খরচ তুলনা করা হয়, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য তা সাশ্রয়ী হবে। তাছাড়া, প্রতিটি নতুন বাস কর্মসংস্থানের সুযোগও সৃষ্টি করতে পারে। এভাবে বিশ্ববিদ্যালয় জনকল্যাণমূলক ব্যয়ের আরও কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারবে।”

উল্লেখযোগ্যভাবে, বাংলাদেশ কাস্টমস ট্যারিফ শিডিউল অনুযায়ী, সিএনজি/এলপিজি/এলএনজি চালিত ডাবল ডেকার বাস আমদানির ক্ষেত্রে ৫% আমদানি শুল্ক প্রযোজ্য। অপরদিকে, ডিজেল বা অন্যান্য জ্বালানিচালিত ডাবল ডেকার বাসের ক্ষেত্রে মোট ৩১% কর প্রযোজ্য, যার মধ্যে কাস্টমস শুল্ক, ভ্যাট এবং অন্যান্য প্রযোজ্য চার্জ অন্তর্ভুক্ত। তবে নির্দিষ্ট কিছু শর্ত পূরণ হলে—যেমন, কোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠান নির্ধারিত যোগ্যতা অর্জন করলে—কর ছাড় বা কর হ্রাসের সুবিধা পাওয়া যেতে পারে, যা কার্যকরভাবে মোট করের পরিমাণ কমাতে সহায়ক হতে পারে।

নিজস্ব বাস বহর থাকা সত্ত্বেও, ঢাবির পরিবহণ অফিস ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউট (আইবিএ)-এর শিক্ষার্থীদের জন্য প্রতিদিন মাত্র দুইটি ট্রিপের (ক্যাম্পাস-হোস্টেল) বিনিময়ে পৃথকভাবে একটি বাস ভাড়া নেয়। যার খরচ প্রতিদিন ৬ হাজার ৫০০ টাকা।

এক মাসে এই ব্যয় প্রায় দুই লাখ টাকায় পৌঁছে। এই পরিমাণ অর্থ একাধিক বিশ্ববিদ্যালয় মালিকানাধীন গাড়ির বড় ধরনের মেরামত বা জ্বালানির খরচ বহন করার জন্য যথেষ্ট। এই বাস্তবতা পরিকল্পনা ও সম্পদ বরাদ্দ নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তোলে, যেখানে কিনা অনেক বাস অচল বা খারাপ অবস্থায় পড়েই থাকে। এ ধরনের সিদ্ধান্তগুলো সম্পদের ঘাটতির চেয়ে বরং দুর্বল ব্যবস্থাপনারই প্রতিফলন বলে মনে করা যেতে পারে।

২০২৪–২৫ অর্থবছরে ঢাবির নিজস্ব বাসগুলোর জন্য জ্বালানি বাজেটে ৬ কোটি ২২ লাখ টাকা বরাদ্দ ছিল। তবে সরকারের ২০% জ্বালানি সাশ্রয়ের পরামর্শ অনুসরণ করে, এর মধ্যে মাত্র ৪ কোটি ৯৭ লাখ ৬০ হাজার টাকা খরচ করা হয়, এবং অবশিষ্ট অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয়।

মে মাসেই শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব বাসগুলোর জ্বালানির জন্য ডিজেল বাবদ খরচ হয়েছে ২৯ লাখ ৩০ হাজার ৬৯৭ টাকা এবং অকটেন বাবদ প্রায় ৬ থেকে ৭ লাখ টাকা। সংরক্ষণ নীতিমালা অনুসরণ করার পরেও এপ্রিল, মে ও জুন মাসে জ্বালানি বাজেটে প্রায় ৮৮ লাখ টাকার ঘাটতি হয়।

প্রকাশিত বার্ষিক জ্বালানি খরচ মে মাসের তথ্যের ভিত্তিতে হিসাব করা সম্ভাব্য খরচের তুলনায় প্রায় ১.১৬ গুণ বেশি, যা জ্বালানি বাজেট নির্ধারণে অতিমূল্যায়ন বা অদক্ষতার ইঙ্গিত দিতে পারে। এই অমিল আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে যখন দেখা যায়, গত পাঁচ বছরে বাংলাদেশের ডিজেলের দাম প্রতি লিটার ৬৫ টাকা থেকে ১১৪ টাকার মধ্যে উঠানামা করেছে, যার সর্বোচ্চ ছিল ২০২২ সালে এবং তা ধীরে ধীরে কমে চলতি বছরের মাঝামাঝি সময়ে এসে ১০২ টাকায় স্থিতিশীল হয়েছে। একইভাবে, অকটেনের দাম ছিল প্রতি লিটার ৮৯ টাকা থেকে ১৩৫ টাকার মধ্যে, যার সর্বোচ্চও ছিল ২০২২ সালে এবং ধীরে ধীরে কমে চলতি বছরের মাঝামাঝি সময়েই ১২২ টাকায় স্থির হয়েছে।

একটি নতুন সিঙ্গেল-ডেকার বাস প্রতি লিটার ডিজেলে ৪ কিলোমিটার পর্যন্ত চলতে পারে। তবে বাসটি পুরানো হয়ে গেলে এটি আর ৩ কিলোমিটারের বেশি চলতে পারে না। এছাড়াও, একটি বাসের ছোটখাটো বার্ষিক মেরামতের জন্য প্রায় ৭৫ হাজার টাকা খরচ হয়।

অর্থনীতিবিদ শাহাদাত হোসেন সিদ্দিকীর মতে, এই ব্যাপক অসামঞ্জস্যতা সম্ভাব্য অব্যবস্থাপনা, অতিরঞ্জিত প্রতিবেদন বা অদক্ষ পরিবহন পরিচালনার ইঙ্গিত দেয়। সরকার নির্দেশিত ২০% জ্বালানি সাশ্রয়ের পরও এমন অতিরিক্ত ব্যয় তাৎক্ষণিকভাবে খতিয়ে দেখার দাবি রাখে।

একাডেমিক ভ্রমণের জন্য যানবাহন ব্যবহার কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত এবং শুধুমাত্র ঢাকার মধ্যে সীমিত থাকে। এজন্য প্রতি কিলোমিটারে জ্বালানির খরচ সহ বাস চালক ও সহকারীর মজুরিও দিতে হয়।

যাত্রী সাড়ার অভাবে সম্প্রতি চালু হওয়া শাটল বাস সার্ভিস বন্ধ হওয়ার সম্ভাবনায় রয়েছে।

ড. শাহাদাত বলেন, “এই বিশ্ববিদ্যালয় একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অবস্থিত, তাই জনসাধারণের প্রবেশ সীমিত করা সহজ নয়। আমার দৃষ্টিভঙ্গিতে, এটি আবশ্যিকভাবে কোনো সমস্যা তৈরি করে না। আমি ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসের পাশ দিয়েই পাবলিক ট্রান্সপোর্ট চলতে দেখেছি। পলাশি, ফুলার রোড, নীলক্ষেত এবং টিএসসির মতো এলাকা প্রধান সড়কের সঙ্গে সংযুক্ত, তাই মানুষ স্বাভাবিকভাবেই সেগুলো গেইটওয়ে হিসেবে ব্যবহার করতে চায়। তবে প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। শুধু অ্যাম্বুলেন্স এবং শিক্ষকদের ব্যক্তিগত গাড়িই প্রবেশের অনুমতি পেতে পারে।”

শিক্ষার্থীদের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, “বাংলাদেশে বর্তমানে পরিবহণ ব্যয় যথেষ্ট বেশি। যদিও এটি একটি আর্থিক চাপ, আমি দেখেছি যে শিক্ষার্থীরা প্রায়ই ক্যাম্পাসের ভেতর রিকশা ভাড়ায় প্রতিদিন প্রায় ২০০ টাকা পর্যন্ত ব্যয় করে। অথচ প্রধান সড়কে মাত্র ২০ টাকা বাস ভাড়া দিতে তারা আগ্রহী নয়—এটি তাদের আচরণে এক ধরনের বৈপরীত্য প্রকাশ করে। বিশ্ববিদ্যালয় চাইলে ২০০ টাকা মাসিক সাবস্ক্রিপশন মডেলে পরিবহণ সেবা দিতে পারে। তবে শিক্ষার্থীদের দৃষ্টিকোণ থেকে এটি বাস্তবসম্মত নাও হতে পারে। কারণ অনেকেই মনে করেন, এই ধরনের সেবা বিনামূল্যে পাওয়া উচিত। কিন্তু অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বললে, কোনো সুবিধা পেতে হলে তার জন্য মূল্য পরিশোধ করতেই হয়। রিকশায় ৫০ টাকা খরচ করে যে উপযোগ পাওয়া যায়, ক্যাম্পাস শাটল ব্যবহারে তার চেয়ে অনেক বেশি উপযোগ পাওয়া সম্ভব।”

২০২৩–২০২৪ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেট এবং ২০২৪–২০২৫ অর্থবছরের প্রস্তাবিত মূল বরাদ্দ অনুযায়ী পরিবহণ অফিসের ব্যয় খাতগুলোতে একাধিক সমস্যা ও অসামঞ্জস্যতা লক্ষ্য করা যায়। এর মধ্যে অন্যতম হলো—‘দায়িত্ব ভাতা’ তালিকাভুক্ত থাকলেও কখনো প্রদান করা হয়নি। এছাড়াও মোবাইল, টিফিন, লন্ড্রি, ক্লান্তি ভাতা, বিনোদন এবং বাংলা নববর্ষের মতো বহু ক্ষুদ্র ভাতা পৃথকভাবে তালিকাভুক্ত, যা বাজেট ব্যবস্থাপনাকে খণ্ডিত বা অতিরঞ্জিত করে তোলার ইঙ্গিত দেয়।

২০২২-২৩ অর্থবছরে ‘শ্রান্তি ও বিনোদন ভাতা’ বাবদ প্রকৃত ব্যয় ৮ লাখ ৬১ হাজার টাকা হলেও ২০২৩-২৪ অর্থবছরে মূল বরাদ্দ দেওয়া হয় ২৮ লাখ ৯৮ হাজার টাকা (২৪০% বৃদ্ধি)। তবে পরের বছরই মূল বরাদ্দ আবার ১৯ লাখ ৭৮ হাজার টাকা দেওয়া হয়। আর্থিক শৃঙ্খলার দৃষ্টিকোণ থেকে এমনটা দুর্বল পরিকল্পনা, প্রভাব খাটানো বা বিবেচনাধীন বাজেটের অপব্যবহারের ইঙ্গিত দেয় বলে মনে করা যেতে পারে।

একইভাবে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে নিম্নতন কর্মচারীদের বেতন বাবদ প্রকৃত খরচ ৫৩ লাখ ৩৭ হাজার টাকা হলেও পরবর্তী অর্থবছরে মূল বরাদ্দ কমে হয় ৪৩ লাখ ৬৭ হাজার টাকা। অথচ অন্যান্য বেতন উপাদান বৃদ্ধি পায়। কর্মীর সংখ্যা কি কমানো হয়েছে, নাকি এটি কোনো তথ্যগত ভুল হয়েছে? কিংবা কোনো পুনর্গঠন প্রক্রিয়া ঘটেছে কি না? — সংশ্লিষ্টদের মনে এমন প্রশ্ন উঠতে পারে।

২০২১–২২ ভিত্তিবছরের ভোক্তা মূল্যসূচক (CPI) অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মে মাসে পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট মুদ্রাস্ফীতি ছিল ৯.০৫%, যা ২০২৫ সালের এপ্রিলের ৯.১৭% থেকে সামান্য কম এবং ২০২৪ সালের মে মাসের ৯.৮৯% অপেক্ষাকৃতভাবে কম।

১২ মাসের গড় মুদ্রাস্ফীতির ক্ষেত্রে, ২০২৫ সালের মে মাসে হার ছিল ১০.১৩%, যা এপ্রিল ২০২৫ সালের ১০.২১% থেকে সামান্য হ্রাস পেয়েছে, তবে এটি এখনও ২০২৪ সালের মে মাসের ৯.৭৩% এর তুলনায় বেশি। এটি ইঙ্গিত দেয় যে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে কিছুটা স্থিতি আসলেও দেশের সামগ্রিক মুদ্রাস্ফীতি উচ্চমাত্রায় বিরাজমান রয়েছে।

কয়েকটি ভাতা (যেমন: মোবাইল, শিক্ষা, বাড়িভাড়া) গত পাঁচ বছর ধরে প্রায় একই রয়েছে। বাংলাদেশের গড় মুদ্রাস্ফীতির হার (প্রায় ৬–৯ শতাংশ) বিবেচনায়, এসব ভাতার প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা ক্রমাগত কমে যাচ্ছে। এতে একটি বিকৃত প্রণোদনা তৈরি হচ্ছে, যেখানে কর্মীরা বাস্তবে প্রয়োজনীয় ক্ষতিপূরণ পাচ্ছেন না, যদিও নামমাত্র বাজেট অপরিবর্তিত থাকছে।

এছাড়াও, ২০২৩–২৪ অর্থবছরের সংশোধিত বরাদ্দ এবং ২০২৪–২৫ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বরাদ্দের মধ্যকার পরিবর্তনের সাথে কোনো যৌক্তিক ব্যাখ্যা বা ব্যাখ্যামূলক নোট সংযুক্ত করা হয়নি। উদাহরণস্বরূপ, উৎসব ভাতা বৃদ্ধি পেলেও ওভারটাইম প্রদানের পরিমাণ কেন কমানো হয়েছে, সে বিষয়ে কোনো স্পষ্টতা নেই।

পুরো বাজেটই যেন পুনরাবৃত্ত ব্যয়ের (বেতন, ভাতা ইত্যাদি) ওপর কেন্দ্রীভূত। নতুন বাস ক্রয়, পরিবহণ ব্যবস্থার ডিজিটালাইজেশন বা অবকাঠামো উন্নয়নের মতো মূলধনি ব্যয়ের জন্য কোনো সুস্পষ্ট বরাদ্দ নেই। ফলে দপ্তরটি দীর্ঘমেয়াদি উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর বিনিয়োগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, যার ফলে পুরোনো যানবাহনের ওপর নির্ভরতা এবং সেবার মান হ্রাস হচ্ছে।

ড. শাহাদাত বলেন, “অনেক বাস অচল বা পরিষেবার বাইরে থাকলেও চালক ও সহায়ক কর্মীদের জন্য বরাদ্দকৃত বেতন খাত এখনও তুলনামূলকভাবে উচ্চ। ফলে অনিবন্ধিত কর্মী, অতিরিক্ত জনবল বা অলস শ্রম ব্যয়ের সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্ন করা যেতে পারে। অর্থনৈতিক দক্ষতার জন্য জনবল এবং কার্যক্রমের সক্ষমতার মধ্যে সামঞ্জস্য থাকা আবশ্যক।”

তিনি আরও বলেন, “স্থায়ী প্রশাসনিক খরচ যেমন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন, পরিবহণ ভাতা ইত্যাদি বেশি হওয়ার পরেও যদি বিশ্ববিদ্যালয় বাসের সংখ্যা বা রুট না বাড়ায়, তাহলে প্রতি কিলোমিটার বা প্রতি শিক্ষার্থী পরিবহনের একক খরচ বাড়তেই থাকবে। এই পরিস্থিতিতে দীর্ঘমেয়াদে এই একক খরচ কাঠামো টেকসই থাকে না।

অর্থনীতিবিদ ড. শাহাদাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে আউটপুটভিত্তিক বাজেট প্রণয়নের আহ্বান জানান। তিনি বেতন খাতে অদক্ষতা নিরীক্ষা করা, ভাতাগুলো একত্র করে পুঁজি খাতে বিনিয়োগ করা, ভাতাসমূহকে মুদ্রাস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা এবং প্রতি কিলোমিটারে জ্বালানি খরচের মতো ব্যয়-দক্ষতার মানদণ্ড প্রয়োগ করার পরামর্শ দেন। এসব পদক্ষেপ গ্রহণ করলে স্বচ্ছতা বৃদ্ধি পাবে, অপচয় কমবে এবং একটি টেকসই ও শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক পরিবহণ ব্যবস্থা গড়ে উঠবে বলে মনে করেন তিনি।

আরএন
সম্পর্কিত   বিষয়:  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়   ঢাবি  


LATEST NEWS
MOST READ
Also read
Editor : Iqbal Sobhan Chowdhury
Published by the Editor on behalf of the Observer Ltd. from Globe Printers, 24/A, New Eskaton Road, Ramna, Dhaka.
Editorial, News and Commercial Offices : Aziz Bhaban (2nd floor), 93, Motijheel C/A, Dhaka-1000.
Phone: PABX- 41053001-06; Online: 41053014; Advertisement: 41053012.
E-mail: [email protected], news©dailyobserverbd.com, advertisement©dailyobserverbd.com, For Online Edition: mailobserverbd©gmail.com
🔝
close